শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০৬তম জন্মদিন পালন

১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সকরুণ চিত্র এঁকে বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক বিদ্রোহী শিল্পী জয়নুল আবেদিন। রোববার (২৯ ডিসেম্বর) বাংলার এই প্রখ্যাত চিত্রশিল্পীর ১০৬তম জন্মদিন। কিংবদন্তি এই শিল্পীর সম্মানে ডুডল প্রদর্শন করছে গুগল। বরেণ্য এই শিল্পীর জন্মদিনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও জেলা প্রশাসন ময়মনসিংহ-এর যৌথ উদ্যোগে র‌্যালি, শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, চিত্রকলা প্রদর্শনী, লোকজ মেলা, লোক সংগীত এবং জয়নুলের শিল্প ও শিল্প চিন্তা শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও সকালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত শিল্পীর সমাধিসৌধে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ ও দোয়া পাঠের মাধ্যমে শিল্পীকে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

দেশের শিল্পকলা চর্চা ও বিকাশের পথিকৃৎ এ শিল্পী ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ এবং মা জয়নাবুন্নেছা। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল প্রবল ঝোঁক। রং তুলির আঁচড়ে ফুল-ফল, বৃক্ষ, লতাপাতা, মাছ, পাখিসহ নানা বিষয় মেলে ধরেছেন সাদা ক্যানভাসে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে ভারতের কলকাতায় গিয়েছিলেন গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখতে। পরে সেখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯৩৮ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে।

১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। তিনি নিসর্গ শিল্পী থেকে নিজেকে রূপান্তরিত করে হয়ে যান এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী শিল্পী। বাংলার দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে ক্যানভাসে চিত্রমালা আঁকেন। ‘দুর্ভিক্ষ’ শিরোনামের চিত্রমালার জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এ ছাড়া তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলো মধ্যে আছে ১৯৫৭ সালে আঁকা ‘নৌকা’, ১৯৫৯ সালে ‘সংগ্রাম’, ১৯৭১ সালে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ‘ম্যাডোনা’ ইত্যাদি। তার দুটি দীর্ঘ চিত্রকর্ম হচ্ছে ১৯৬৯ সালে আঁকা ‘নবান্ন’ এবং ১৯৭৪ সালে আঁকা ‘মনপুরা-৭০’। যা বিশ্ববন্দিত দু’টি শিল্পকর্ম।

তিনি চিত্রাঙ্কনের চেয়ে চিত্রশিক্ষা প্রসারের ওপর অনেক বেশি সময় ব্যয় করেছেন। অনুমান করা হয় তার চিত্রকর্মের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এই কীর্তিমান শিল্পীর ৮০৭টি চিত্রকর্ম সংগৃহিত আছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সংগ্রহে আছে প্রায় ৫০০ চিত্রকর্ম। এছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। এমন কি তার পরিবারের কাছে এখনো প্রায় চার শতাধিক চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। ময়মনসিংহের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত চিত্রকর্মের সংখ্যা ৬২টি। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক, বিদ্রোহী ইত্যাদি।

১৯৪৮ সালে পুরান ঢাকার জনসন রোড ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের দুটি কক্ষে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু করেন জয়নুল আবেদিন। তিনিই ছিলেন এর প্রথম শিক্ষক। ১৯৫৬ সালে শাহবাগে একটি স্থায়ী জায়গা পায় জয়নুল আবেদিনের সেই আর্ট স্কুলের স্বপ্ন। শিল্পাচার্যের সেই স্বপ্ন এখন আটটি বিভাগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। স্বপ্নের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘসময় ছাত্রদের চারুকলা শিক্ষা দিয়েছেন। প্রেরণা দিয়েছেন স্রেফ ড্রয়িং না শিখে সত্যিকারের শিল্পমনা হতে। ১৯৬৮ সালে ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রদের তরফ থেকে পান ‘শিল্পাচার্য’ উপাধি। ১৯৭৪ সালে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানও লাভ করেন জয়নুল আবেদিন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৭৬ সালের ২৮ মে দীর্ঘ ৬ মাস ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগে মাত্র ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।