মঙ্গল আলোর’ আশা নববর্ষের প্রভাতে

পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রভাতে মহামারী ক্লান্ত মানুষের সামনে লড়াইয়ের উজ্জীবনী গান তুলে ধরে ছায়ানটের শিল্পীরা গাইলেন “আমি ভয় করব না, ভয় করব না। দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই, মরব না।”

নজিরবিহীন এই পরিস্থিতিতে আশার বাণী শুনিয়ে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, “আমরা আশা করছি, অন্ধকারের উৎস থেকে আলো উৎসারিত হবেই। নতুন বছর বয়ে আনবে সর্বজনের জন্য মঙ্গলবার্তা। আলো আসবেই।”

ছায়ানটের বর্ষবরণের ডিজিটাল আয়োজনে গান, আবৃত্তিতে মানুষের মঙ্গল কামনা ছাড়াও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ছিল দেশাত্নবোধক গানের পরিবেশনা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এবার বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন ভোর থেকেই দেশে ‘কঠোর লকডাউন’ শুরু হয়েছে।

মহামারী পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এর আগেই জনসমাগম করে বাংলা নববর্ষ উদযাপন না করে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তাই বাঙালির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রতীক হয়ে ওঠা রমনা বটমূলের সঙ্গীত আয়োজন টানা দ্বিতীয়বার বাতিল করা হয়। গত বছরের মত এবারও ডিজিটাল মাধ্যমে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান নিয়ে হাজির হয় ছায়ানট।

বুধবার সকাল ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয় বর্ষবরণের এই আয়োজন। ডিজিটাল মাধ্যমে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে রমনার বটমূলের পুরানো আয়োজন ও নতুন রেকর্ড করা পরিবেশনার সমন্বয়ে।

ফসলি সন হিসেবে মুঘল আমলে যে বর্ষ গণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবে রূপ নেয়। যা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে প্রেরণা দিয়ে আসছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

১৯৬৭ সাল থেকে নতুন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রমনার বটমূলে ছায়ানট যে প্রভাতী আয়োজন করে আসছে, বিশ্ব বাঙালির কাছে তা নতুন বছরকে বরণ করার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এর আগে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রতিবছরই এই পরিবেশনা হয়েছে।

কিন্তু গত বছর তাতে মহামারী যে দাড়ি টেনেছিল, এবারও তা ভাঙা যায়নি।

সংক্রমণ আর মৃত্যুর রেকর্ডের ওঠানামার এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে বাঙালিকে লড়তে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানার যুদ্ধে। ফলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে রমনার পথে যে উৎসব নামার আশা ছিল, সেখানে বাধ্যতামূলক ঘরবন্দি জীবনকে মেনে নিতে হচ্ছে।

হতাশার সেই সুর ছুয়ে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, “উৎসবের আমেজ নেই। স্বজন হারানোর বেদনা আর সংক্রমণের শঙ্কা আজ সর্বজনের অন্তরে।

“তবে পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে নিছক নববর্ষ উদযাপন নয়, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে বাঙালি যে পথ পরিক্রমায় অংশ নিয়েছে, সে পথ কখনই মসৃণ ছিল না।”

মহামারীতে বিপর্যস্ত সময়েও বাংলাদেশের অগ্রগতি যে নতুন আশা জাগিয়ে রেখেছে, সে কথাও বলেন ছায়ানট সভাপতি।

“বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, নববর্ষের আয়োজন সর্ব ধর্মের বাঙালিকে ঐক্যসূত্রে যুক্ত করে তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অসংখ্য প্রাণের আত্মদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সংস্কৃতির যাত্রাপথ নির্বিঘ্ন হয়েছে বলা যায়।

“অর্ধশতবর্ষ পরে ধ্বংসস্তুপ থেকে জেগে ওঠা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে ঈর্ষনীয় সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি আমাদের আশাবাদী করে তোলে।”

তবে এই সময়েও ধর্মীয় মৌলবাদ চোখ রাঙাচ্ছে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে।

সনজীদা খাতুন বলেন, “ধর্মের মর্মবাণীকে উপেক্ষা করে নতুন অবয়বে উত্থিত ধর্ম বিদ্বেষ সম্প্রীতির সমাজকে বিনষ্ট করতে সচেষ্ট। লোভের বিস্তার বৈষম্য সৃষ্টি করছে। খণ্ডবিচ্ছিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ করছে সামাজিক অবক্ষয়ের।

“দেশের অগ্রযাত্রাকে অক্ষুন্ন রেখে নেতিবাচক প্রবণতাকে রোধ করবার জন্যে অতীতের মত বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার প্রসার মানবিক সমাজ গঠনে এক অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে।”